কওমীর আঙ্গিনায় নবজাগরণের ডাক

কওমীর আঙ্গিনায় নবজাগরণের ডাক
সৈয়দ শামছুল হুদা


১৮৬৬সালে পরাধীন ভারতে দারুল উলূম দেওবন্দ প্রতিষ্ঠার পর বহু চড়াই-উৎরাই পার হয়ে বাংলার মুসলমানরা বৃটিশদের নিকট থেকে প্রথম স্বাধীনতা লাভ করে ১৯৪৭সালে। পাশাপাশি ভারতের ভ্রাম্যন্যবাদী হিন্দুদের নাগপাশ থেকেও বাংলার মুসলমানরা মুক্তি লাভ করে। স্বাধীনতা লাভের এই সুযোগটুকুতে বাংলার আলেম সমাজ নিজেদেরকে সম্পূর্ণরূপে স্বাধীনতার সুফল লাভের জন্য প্রস্তুত করেনি। অতঃপর পাকিস্তানী শাসকগোষ্ঠীর অদূরদর্শিতা, বাড়াবাড়ির কারণে ১৯৭১সালে ভাষার ভিত্তিতে বাংলার মুসলমানরা আরো গভীরভাবে স্বাধীনতার সুফল ভোগ করার জন্য পূর্ণাঙ্গ স্বাধীনতা লাভ করে। কিন্তু আফসোসের বিষয় হলো, দু’দুবার দেশ স্বাধীন হলেও বাংলার আলেম সমাজ এখনো মানসিকভাবে স্বাধীনতার সুফল ভোগ করার জন্য, বা স্বাধীনতাকে সুন্দরভাবে কাজে লাগানোর জন্য কোন প্রকার প্রস্তুতি গ্রহন করেনি।

ভারতের দারুল উলূম দেওবন্দ এর আদর্শ, চিন্তা-চেতনা, নৈতিকতাকে ধারণ করে বাংলাদেশে অসংখ্য মাদ্রাসা গড়ে উঠে। দুর্ভাগ্যজনক হলেও সত্য যে, দারুল উলূম দেওবন্দ রাজনৈতিকভাবে হিন্দুত্ববাদের নাগপাশ থেকে স্বাধীনতা লাভ করতে পারেনি। সেই কারণে তারা ইচ্ছে থাকা সত্ত্বেও অনেক কিছু বাস্তবায়ন করতে পারছে না। কিন্তু আমাদের সমস্যা কোথায়? বাংলাদেশের স্বাধীনতা কি শুধু আওয়ামীলীগ বিএনপির জন্য? এদেশের আলেম সমাজের জন্য কি এসব স্বাধীনতার কোন মূল্য নেই? আমাদের কিছু মহান মানুষ যারা অবচেতন মনে আমাদেরকে এখনো একটি পরাধীন দেশে দারুল উলূমের সীমিত পরিসরে যে শিক্ষা কারিকুলাম নিয়ে পড়ে আছে, আমাদেরকেও সেই সীমিত জায়গায় আবদ্ধ রাখতে বদ্ধপরিকর। তাহলে দুই দুইবার স্বাধীনতা লাভের কী অর্থ হতে পারে?

আমাদের চাল-চলন, মানসিকতায় এখনো মনে হয় আমরা বৃটিশ সরকারের নিয়ন্ত্রনেই আছি। সরকার থেকে খুব সচেতনভাবে দূরে থাকাকেই কেরামতি মনে করছি। এসব কারণে যাদের মধ্যে ইসলাম, মুসলমানদের প্রতি সামান্য দরদ নেই তারাই বারবার ঘুরে ফিরে ক্ষমতায় আসছে। আর আমরা ছাগলের তিন নাম্বার বাচ্চার মতো শুধু তাকিয়ে তাকিয়ে দেখছি। বৃটিশ আসার আগে এদেশ মুসলমানরা শাসন করেছে। এদেশে ইসলামী শিক্ষা ছিল। সেই সময়ে তারা যে শিক্ষা দিয়ে রাষ্ট্র পরিচালনা করেছে আমাদেরকে সেই শিক্ষা ব্যবস্থা ফিরিয়ে আনতে হবে। আমরা এখন স্বাধীন হয়েছি। দেশ আমাদের। রাষ্ট্র আমাদের। আমাদের নতুন প্রজন্মকে এটা খুব করে বুঝতে হবে যে, বৃটিশ আসার আগে যাদের হাতে এদেশ ছিল, যেই শিক্ষা ব্যবস্থা দ্বারা ৭শত বছর এদেশ শাসিত হয়েছে আমাদেরকে সেই শিক্ষাকারিকুলামে ফিরে যেতে হবে। তার সাথে আধুনিক উৎকর্ষতার সমন্বয় সাধন করতে হবে।

আমরা এসব বিষয়ে কথা না বলতে বলতে আজকের কওমী মাদ্রাসা কোথায় গিয়ে দাঁড়াচ্ছে একটু খেয়াল করছেন তো? এই করোনাকালে কওমী মাদ্রাসার শিক্ষকদের আর্থিক ভিত্তির দূর্বলতা চরমভাবে প্রকাশ হয়ে পড়েছে। কেউ চাইলে খুব সহজেই কওমী মাদ্রাসার আয়-উন্নতি নিয়ে তামাশা খেলতে পারে। কোরবানী চামড়ার দাম একটি বড় উদাহরণ। আমাদেরকে এই সীমিত মানসিকতার দাসত্ব থেকে বেড়িয়ে আসতে হবে।

কওমী অঙ্গনের নব প্রজন্মের সামনে আমি আহবান জানাচ্ছি, সেই সীমিত গন্ডির ভুল পথ থেকে বের হয়ে আসুন। কওমী মাদ্রাসার বর্তমান অধিকাংশ মুহতামিম ভুল পথে পরিচালিত হচ্ছে। তারা নবীন আলেমদের কর্ম সংস্থান নিয়ে কোন চিন্তা করে না। নিজেদের সাহেবজাদাদের নিয়ে খুব তৃপ্তির সাথে বিলাসী জীবন যাপন করছেন। অপরদিকে সাধারণ আলেমদের সাথে সাধু সেজে অনেকেজেই তাকওয়ার মিথ্যাবুলি শোনাচ্ছেন। মনে রাখবেন, এদেশে আমরা জন্মেছি। এদেশে রাজত্ব করার, এদেশ শাসন করার, এদেশে নিজেদেরকে সম্পূর্ণরূপে প্রতিষ্ঠিত করার সকল সাংবিধানিক অধিকার আমার আছে। আমি কেন এসব ছেড়ে দিবো?

করোনা পরবর্তী জীবনে কওমী মাদ্রাসার পরিচালনা ব্যবস্থায় পরিবর্তনের ব্যাপক ডাক দিতে হবে। জীবনঘনিষ্ট কারিকুলাম তৈরী করতে হবে। আমরা আর রাষ্ট্র নিয়ে সেক্যুলার ভাবনায় পড়ে থাকতে পারি না। পশ্চাদগামি হতে হতে আমরা সর্বত্র পিছিয়ে পড়েছি। দেশের সকল ব্যবসা-বাণিজ্য, চাকুরীতে আমাদের ন্যায্য অধিকার প্রতিষ্ঠার জন্য এখন থেকেই প্রস্তুতি নিতে হবে। সকল কওমী সন্তানদের কৌশলে রাষ্ট্র থেকে দূরে সরে থাকার ইচ্ছেকৃত ভুলের মায়াজাল ছিন্ন করতে হবে। দূর্নীতিগ্রস্থ এ সমাজ ব্যবস্থার মূলোৎপাটন করতে হলে আমাদের শিক্ষা সিলেবাসে ব্যাপক পরিবর্তণ, পরিমার্জন করতে হবে।

ইসলাম সবচেয়ে আধুনিক ধর্ম। কুরআন ও হাদীসের প্রতিটি বাণী সকল যুগের মানুষের শ্রেষ্ঠত্ব অর্জনের অন্যতম হাতিয়ার। আল্লামা ইকবালের প্রতিটি কবিতা আমাদেরকে জেগে উঠার আহবান জানায়। আমাদের জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের কবিতা, কবি ফররুখ আহমদের কবিতা আমাদের জেগে উঠার আহবান জানায়। অথচ আমরা স্বেচ্ছায় কুঁড়েঘরে বন্দি হয়ে থাকতে আজন্ম পণ করে বসে আছি! দুর্ভাগ্যজনক। বাংলাদেশের ব্যবসা-বাণিজ্য, চাকুরী, কর্ম ক্ষেত্র কোথাও নেই কওমী আলেম সমাজ। লক্ষ লক্ষ আলেম শুধুমাত্র মসজিদ মাদ্রাসার সীমিত আসনকেই বিরাট কিছু ভেবে বসে আছে। যে কারণে গত ৫০/৬০বছরে আজ কওমী মাদ্রাসার অভ্যন্তরে মিনি রাজতন্ত্র কায়েম হয়েছে। সেখানে অন্যকারো প্রবেশাধিকার নেই। মেধাবী শিক্ষার্থীদের কোন কর্মনেই। মেধাবীরা যাতে নিজেরা কিছু না করতে পারতে পারে তারজন্য নানা ওয়াজ নসিহত করে বিবেক-বুদ্ধির প্রতিবন্ধি বানিয়ে রেখেছে।

ওহে কওমী তরুন সমাজ! তোমরা জেগে উঠো। অধিকার আদায়ের প্রশ্নে দেশে নবগাজরণ তৈরী করতে হবে। পাকিস্তানের আল্লামা তাকী উসমানী দা.বা, শিক্ষা ব্যবস্থায় নবজাগরণের ডাক দিয়েছেন। আমাদেরকেও সেই পথে আগাতে হবে। মাতৃভাষার নেতৃত্ব গ্রহন করতে হবে। স্বাধীন দেশের স্বাধীন নাগরিক হিসেবে আমাদেরকে সকল কিছু চিন্তা করতে হবে। পরাধীন দেশের অপূর্ণাঙ্গ পরাধীন সিলেবাসে পরে থাকার কোন সুযোগ নেই। কওমী মাদ্রাসায় পড়লে শুধু দান সাদকা খেয়েই পড়তে হবে। সেখানে রাষ্ট্র কোন কিছুই দিবে না। আর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, বুয়েট, মেডিকেলে নামেমাত্র মুল্যে লেখাপড়া করে তারা রাষ্ট্রের সব ভোগ করবে এটা হতে পারে না। তাদের পেছনে রাষ্ট্র ১০টাকা খরচ করলে আমার সন্তানের লেখাপড়ার জন্যও রাষ্ট্রকে ১০/- টাকা খরচ করতে হবে। এ রাষ্ট্র সকলের। কারো একার বাপ-দাদার নয়।

ওহে কওমিয়ান! নিজেদেরকে রাষ্ট্রের মালিক ভাবতে শেখো। তোমরা রাষ্ট্রের গোলাম নও। তোমরা এখনো কালোজিরা, মধু,আর আতর তাসবীহের ব্যবসার মধ্যে সীমিত থাকবে, আর তোমার ভাইয়েরা প্রাইভেট বিমান বানাবে, প্রাইভেট হেলিকপ্টারে চড়বে, বড় বড় শিল্পের মালিক হবে কেন? কেন এই বৈষম্য ভাঙ্গা যাবে না। কেন আমরা ইচ্ছেকৃতভাবে ওদেরকে ব্লাঙ্ক চেক দিয়ে রাখবো?

প্লিজ! একবার নিজেকে নিয়ে নীরবে ভাবো। আমরা কারা? এদেশে আমাদের অধিকার কোথায়? সমাজ ও রাষ্ট্রে আমাদের অবস্থান কতটুকু? সমাজের পয়সাওয়ালারা আমাদের দিকে কেন দয়ার দৃষ্টিতে তাকায়? ওরা কেন সোনার চামচ মুখে দিয়ে বড় হয়? আমরা কেন দান সদকার ভেড়াজালে বন্দি? ওরাতো বড় ফকির। ওরা তোমার বাপ-দাদার ট্যাক্সের টাকায় লেখাপড়া করে ওরা রাষ্ট্রের মালিক। আর তুমি ফকির। এভাবে চলতে পারে না।

No comments

Powered by Blogger.